BREAKING
প্রাচীন ঐতিহ্য মুখোশ শিল্প অবলুপ্তির পথেবাংলার ভোটাধিকার রক্ষায় ও এস.আই.আর এর বিরোধিতায় উত্তর কলকাতায় অল ইন্ডিয়া উন্নয়ন উদ্বাস্তুর প্রতিবাদ সভানাজিরহাটে নছিমিয়া হাই মাদ্রাসা পরিচালন সমিতি নির্বাচনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়ী তৃণমূল সমর্থিত ৬ প্রার্থীজগদ্ধাত্রী পুজোয় উঠে এল এক টুকরো চন্দননগরপ্রাচীন ঐতিহ্য মুখোশ শিল্প অবলুপ্তির পথেবাংলার ভোটাধিকার রক্ষায় ও এস.আই.আর এর বিরোধিতায় উত্তর কলকাতায় অল ইন্ডিয়া উন্নয়ন উদ্বাস্তুর প্রতিবাদ সভানাজিরহাটে নছিমিয়া হাই মাদ্রাসা পরিচালন সমিতি নির্বাচনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়ী তৃণমূল সমর্থিত ৬ প্রার্থীজগদ্ধাত্রী পুজোয় উঠে এল এক টুকরো চন্দননগর

প্রাচীন ঐতিহ্য মুখোশ শিল্প অবলুপ্তির পথে

আপডেট প্রতিদিন ওয়েবডেস্ক, বেবি চক্রবর্ত্তী :- বুধবার সন্ধ্যায় কলকাতা রোটারি সদনে ( গবেষক – পরিচালক) ইন্দ্রনীল সরকার পরিচালিত মুখোশ নিয়ে একটি তথ্য চিত্র প্রদর্শিত হয়। যেখানে ভারতের ১৩ টি রাজ্যে মুখোশ মিউজিয়ামে রাখা হয়। তিনি বলেন যে, ” মিউজিয়ামে প্রদর্শিত প্রাচীন ঐতিহ্য বিভিন্ন মুখোশ মৃত প্রায় বলা চলে। ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এক চিরাচরিত সংস্কৃতির বন্দি অবস্থাতেই দেখবে। বর্তমানে বিভিন্ন অর্থনৈতিক কারণে ক্রমশ হারিয়ে যেতে বসেছে। তাই দশটি রাজ্যে পাওয়া যাবে। এরমধ্যে আসাম – নাগাল্যান্ড উল্ল্যেখযোগ্য। ”

ভারতীয় প্রাচীন ঐতিহ্য মুখোশ শিল্প ক্রমশ অবলুপ্তির পথে।
মুখোশ মানব সভ্যতার অন্যতম প্রাচীন সাংস্কৃতিক ও আচারিক উপাদান। যার ইতিহাস হাজার হাজার বছরের পুরনো। প্রাচীনকালে শিকার, ধর্মীয় অনুষ্ঠান, ঝাড়ফুঁক, এবং আত্মরক্ষার জন্য যুদ্ধের ঢাল হিসেবে জন্য মুখোশ ব্যবহৃত হতো। পরবর্তীকালে থিয়েটার, নৃত্য যেমন- ছৌ নাচ এবং বিনোদনে এর ব্যবহার জনপ্রিয় হয়। মুখোশ কাঠ, মাটি, বেত, ও কাগজের মণ্ড দিয়ে তৈরি।

প্রাচীনকালে আদিম মানুষ শিকারের সময় ছদ্মবেশ ধারণ করতে বা আত্মিক শক্তি অর্জনের বিশ্বাসে পশুর মুখোশ পরত। আদিবাসী সমাজে শামানিক আচার-অনুষ্ঠানে দেবদেবী বা অশুভ আত্মা তাড়াতে মুখোশ ছিল অবিচ্ছেদ্য।
পাশাপাশি প্রাচীন গ্রিস ও রোম- গ্রিক থিয়েটারে অভিনেতারা ভিন্ন চরিত্র ফুটিয়ে তুলতে মুখোশ ব্যবহার করতেন। এরপর অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় মৃত ব্যক্তির মুখে মুখোশ দেওয়ার রীতি ছিল। মধ্যযুগ ও রেনেসাঁ ইউরোপে উৎসব, নাটক এবং ‘প্লাগ ডক্টর’ বা চিকিৎসকরা মহামারীর সময় ১ম শতাব্দীতে বিশেষ ধরণের মুখোশ পরতেন।

একসময় বাংলার ঐতিহ্য বাংলার লোকসংস্কৃতিতে মুখোশ অপরিহার্য। বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের ছৌ নাচে এবং আসামের সাউতরার মুখোশ শিল্প বিশ্ববিখ্যাত।

ভারতের শিল্পকুশলতার এক বড় দৃষ্টান্ত। শৈল্পিক দিক থেকে পশ্চিমবঙ্গের শিল্পকলার মধ্যে নান্দনিক ও সাংস্কৃতিক অভিনবত্ব রয়েছে। সঙ্গীত, নৃত্য, চিত্রকলা, মুখোশ, স্থাপত্য, ভাস্কর্য ইত্যাদির মেলবন্ধনে পশ্চিমবঙ্গের শৈল্পিক ঐতিহ্য খুবই সমৃদ্ধশালী।

ভারতের লোকনৃত্যের ক্ষেত্রে মুখোশের ব্যবহার দেখা যায়। পুরুলিয়া ছৌ নাচে মুখোশের ব্যবহার হয়। মালদা জেলায় গম্ভীরা উৎসবের গম্ভীরা নৃত্যের সময় গম্ভীরা মুখোশ ব্যবহৃত হয়। পৌরাণিক চরিত্র ফুটিয়ে তুলতে ও লোকসংস্কৃতির অঙ্গ হিসেবে মুখোশের ব্যবহার হয়।

অন্যদিকে পুরুলিয়া ছৌ নাচে মুখোশের ব্যবহার পুরুলিয়া ছৌ কে এক অন্য মাত্রা দিয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের লোকশিল্পের অংশ হিসেবে ছৌ মুখোশ খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

পশ্চিমবঙ্গের মালদহ জেলায় গম্ভীরা উৎসবে মুখোশ পরে একক বা দলবদ্ধ নৃত্য পরিবেশিত হয়। এইসব অঞ্চলের নিম্নবর্গীয় হিন্দু, কোচ-রাজবংশী, পোলিয়া সম্প্রদায়ের মধ্যে এই নাচের প্রচলন রয়েছে।

গম্ভীরা নৃত্যের মুখোশ বিভিন্ন ধরণের মুখোশ ব্যবহৃত হয়। হিন্দু পৌরাণিক চরিত্রের বাণ, কালী, নরসিংহী, বাশুলী, গৃধিনীবিশাল, চামুণ্ডা, উগ্রচণ্ডা, ঝাঁটাকালী, মহিষমর্দিনী, লক্ষ্মী-সরস্বতী, হিরণ্যকশিপুবধ, তাড়কাবধ, শুম্ভনিশুম্ভ বধ ইত্যাদির মুখোশ ব্যবহৃত হয়। এই মুখোশের মধ্যে সবচেয়ে আকর্ষণীয় নরসিংহী মুখোশ।

শিবের মুখোশ নবদ্বীপের লৌকিক ধর্মীয় অনুষ্ঠানের অংশ। চৈত্র মাসে শিবপার্বতীর বিয়ের সময় এই মুখোস তৈরি করা হয়। লৌকিক শৈব সংস্কৃতির সাথে এই মুখোশ ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এটিকে মুখোশ বলা হলেও আসলে এটি মাটি দিয়ে তৈরি মূর্তি। বহুবর্ণশোভিত এই মুখোসটি লৌকিক শিল্পের অন্যতম নিদর্শন। শিল্পী শ্রী নারায়ণ পাল এখনও এই ধরণের মূর্তি তৈরি করেন।
কাঁচা মাটি দিয়ে ছাঁচে ফেলে এটি তৈরি করা হয়। এরপর এটিকে রোদে শুকিয়ে নেওয়া হয়। রোদে শুকিয়ে গেলে সাদা রং করা হয় এবং চোখ নাক কান আঁকা হয়। মাথায় সোনালী রঙের টোপর পরানো হয়। টোপর বা মুকুটের উপরে ফনাযুক্ত সাপ থাকে।
চৈত্র মাসে শিবের বিয়ে উপলক্ষ্যে এই মুখোশ তৈরি করা হয়। এই মুখোশকে চতুর্দলায় সাজিয়ে নিয়ে বাড়ি বাড়ি নিয়ে যাওয়া হয়। বাড়ি বাড়ি থেকে ভিক্ষা করে সেই টাকা দিয়ে শিবের বিয়ের আয়োজন করা হয়। মূলত ছোট ছোট ছেলেরা শিবের বিয়ের আয়োজন করে।

‘মুখোশ’- মুখের সঙ্গে মিলেমিশেই একাত্ম হয়ে উঠেছে। ছদ্মবেশে সুরক্ষা, প্রদর্শন, বিনোদনে মুখোশের ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়। সুদূর অতীত থেকেই পৃথিবীব্যাপী মুখোশের প্রচলন দেখা যায়। পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জেলায় ভিন্ন ধরণের মুখোশ তৈরি হয়।

মানুষের ব্যক্তি চরিত্রকে অন্য এক সত্ত্বায় রূপ দেয় মুখোশ। আদিম সমাজে অশরীরী আধিভৌতিক জগতের সঙ্গে ব্যক্তির সংযোগ ঘটাতে মুখোশের ব্যবহার হতো। প্রচলিত আছে ঈশ্বর, জীবিত এবং মৃত মানুষের যোগসূত্র ঘটাতে মুখোশ রহস্য ও গুপ্তবিদ্যার হাতিয়ার। আদিকাল থেকেই ধর্মীয় রীতি, উৎসব, পার্বন থেকে শুরু করে আত্মরক্ষায় মুখোশের ব্যবহার করা হত। মাটি, কাঠ, বাঁশ, কাগজ দিয়ে বানানো হয় মুখোশ। পৃথিবীর সর্বত্রই রয়েছে মুখোশের ব্যবহার। ফ্রান্স ও স্পেনে খ্রিস্টপূর্ব কুড়ি হাজার বছর আগে মুখোশের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। ধর্মাশ্রয়ী মুখোশ যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে ধর্মবিযুক্ত মুখোশও। উত্তর দিনাজপুর জেলায় কাঠ ও শোলার তৈরি হয় মুখোশ।

  • ● কাঠের মুখোশ – কাঠের মুখোশ তৈরির জন্য ব্যবহার করা হয় গামার ও ছাতিম কাঠ। এসব কাঠ ওজনে হালকা তাই সহজে ফেটে যায় না। এছাড়া শিমুল, শিশু, আমি, জাম কাঠেও মুখোশ তৈরি হয়। মুখোশ তৈরির জন্য প্রথমে ৫০ সেমি লম্বা ও ৯০ সেমি পরিধিবিশিষ্ট কাঠের খণ্ড নিতে হয়। তারপর ওই কাঠখণ্ডকে লম্বালম্বি চেরাই করে দু’খণ্ড করে দুটো মুখোশ তৈরি করা হয়। মুখোশ তৈরির জন্য কাঁচা কাঠেই ব্যবহার করতে হয়। চেরাই করার পর তুলনামূলকভাবে উত্তল বাইরের অংশেই খোদাই কাজটা আগে করা হয়। কান, নাক, দাঁত সব আগে বার করে নেওয়া হয়। বিভিন্ন আকারের বাটালির সাহায্যেই এই কাজ করা হয়। পর্যায়ক্রমে সব কাজ হয়ে গেলে তিনটি ফুটো করা হয় বাঁধার জন্য- দুটো দুই কানের পাশে এবং একটি ওপরের মাঝামাঝি অংশে। এছাড়া মুখোশবিশেষে দুই চোখের নিচে বা নাচের সময় শিল্পী দেখতে পান এবং নিশ্বাস-প্রশ্বাস নিতে পারেন। এরপর রং করার আগে মসৃণ করার জন্য শিরিষ কাগজ ব্যবহার করা হয়। বাইরের খোদাই কাজের পর ভিতরের কাঠ গোলাই বাটালি দিয়ে বার অংশেই তারপিন মেশানো তেল রং লাগানো হয়।
  • ● শোলার মুখোশ- কাঠের মুখোশের মতো খুব বেশি ব্যবহার না হলেও এ জেলায় শোলার মুখোশেরও তৈরি করা হয়। এই মুখোশ প্রধানত পুজোকেন্দ্রিক। উজ্জ্বল বর্ণময় এই মুখোশ তৈরিতে প্রথমে পুকুর বা জলা থেকে শোলা সংগ্রহ করা হয়। এরপর লম্বা লম্বা শোলার পাত কাটা হয়। এগুলিই আঠা ও প্রয়োজনমতো কাগজের সাহায্যে মুখোশের রূপ দেওয়া হয়। বাজার থেকে কেনা রং ব্যবহার করা হয়। কালী আর মাশান এর শোলার মুখোশ লাগে বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ মাসে।

মুখোশচিত্র ভারতের লোক কারুশিল্পের ঐতিহ্যের এক অনন্য শৈল্পিক অংশ। বাংলার সামাজিক ইতিহাসের একটি মূল্যবান সম্পদও বটে। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন, ‘দেশের লোকসংস্কৃতির মধ্যে অতীত যুগের সংস্কৃতির বহু নিদর্শন আজ সংযুক্ত আছে, মুখোশচিত্র শিল্প সেগুলোর অন্যতম। এটি আমাদের জাতির পূর্ণাঙ্গ লোকসংস্কৃতির মূল্যবান উপকরণ’। মানব সমাজের মুখোশচিত্র সম্পর্কিত শিক্ষার তথ্য ও তত্ত্ব সংবলিত বিষয়কে সাধারণ অর্থে মুখোশচিত্রের ইতিহাস বলা হয়। মুখোশচিত্র গ্রামবাংলার সাধারণ মানুষের সৃষ্টি। চরিত্রের সঙ্গে সম্পর্কিত মুখোশ মুখে লাগিয়ে মঞ্চে অভিনয় ও পূজা-পার্বণে নৃত্য পরিবেশিত হয়। যে কোনো অনুষ্ঠানে নৃত্য-অভিনয়ের সঙ্গে মুখোশের আত্মিক সম্পর্ক রয়েছে। বিভিন্ন ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে নানাভাবে মুখোশের আবির্ভাব ঘটে। বাংলাদেশের গ্রামের বিভিন্ন মেলায় বা যাত্রানুষ্ঠানে, চৈত্রসংক্রান্তিতে নৃত্যের আয়োজন হতো, সেই মেলায় বা ধর্মীয় অনুষ্ঠানে পসরা সাজানো হতো নানা ধরনের মুখোশ দিয়ে। অনেক ধরনের মুখোশ আছে যেগুলোকে খেলনা জাতীয় মুখোশ বলা যেতে পারে। আবার অনেক মুখোশ আছে যা নৃত্য, অভিনয় এবং পূজা-পার্বণে ব্যবহার করা হয়। মুখোশচিত্রের প্রতিটি শিল্পীই তাদের তৈরি মুখোশকে সামান্য রদবদল করে বিভিন্ন চরিত্র সৃষ্টি করে। যেমন- বাঘ, ভালুক, বানর, দেবদেবী ইত্যাদি। আর এসবই শিল্পীর হাতের সৃষ্ট কলাকৌশল। মুখোশ কাঠ, কাগজ, মাটি, বেত, শোলা ইত্যাদি উপকরণ দিয়ে তৈরি করা হয়ে থাকে। মুখোশ তৈরিতে লাল, নীল, হলুদ এবং কালো রং প্রধান। বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে মালাকার, পাল, কুমার, আচার্য এবং অন্যান্য ঐতিহ্যবাহী শিল্পী মুখোশ তৈরি করে থাকেন। মুখোশ তৈরি করতে গ্রামবাংলার দেবদেবীর মুখাকৃতি এবং বিভিন্ন ধরনের পশুপ্রাণীর মুখের মতো তৈরি করে যা ডাইস বা ছাপ হিসেবে পরিচিত তার ওপর মুখোশের কাঠ ও বেত পোঠা তৈরি করে নিতে হয়। পরে এগুলো শিল্পীরা হাতে টিপে টিপে দেবদেবীর কিংবা পশু আকৃতির মুখোশ তৈরি করেন। যেমন- মুণ্ড মূর্তির মুখোশ, ওলাই চণ্ডীর মুখোশ, বড়াম চণ্ডীর মুখোশ, বড়খা গাজীর মুখোশ, ধর্ম ঠাকুরের মুখোশ, সত্য নারায়ণ সত্য পীরের মুখোশ, পীর গোড়া চাঁদের মুখোশ, ওলা বিবির মুখোশ, ভৈরবের মুখোশ, ঘাটু দেবতার মুখোশ, মানিক পীরের মুখোশ ইত্যাদি।আসলেই মুখোশচিত্র এখন লুপ্তপ্রায়। অন্যান্য শিল্পের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় মুখোশচিত্র শিল্প আস্তে আস্তে তাদের প্রাধান্য হারিয়ে ফেলেছে। ফলে, ঐতিহ্যবাহী মুখোশ শিল্পটি লুপ্ত হতে চলেছে। মুখোশচিত্রের শিল্পীরা এখন কালের বিবর্তনের সঙ্গে মুখোশচিত্রের পাশাপাশি তৈরি করেছেন শোলার আধুনিক কাজ এবং শখের হাঁড়িসহ অন্যান্য কাজ। তার কারণ বাঙালির চিরায়ত বিভিন্ন উৎসব ব্যতিত মুখোশচিত্রের ব্যবহার লক্ষ্য করা যায় না। তাই মুখোশচিত্র শিল্পীরা অন্যান্য শিল্পের সঙ্গে এ মুখোশচিত্রটিকে ধরে রেখেছে। আমাদের লোককারুশিল্পে মুখোশচিত্রের সংগ্রহ, সংরক্ষণ এবং প্রদর্শন শুধু জাদুঘরে কিংবা বিভিন্ন মেলা উৎসবে সীমাবদ্ধ না রেখে এ কাজে জড়িত শিল্পীদের পৃষ্ঠপোষকতার মাধ্যমে এ শিল্পের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা সম্ভব। ভয় ছিল, বাসনা ছিল, ছিল অলীকের প্রতি আসক্তি। মানুষের অন্তরমহল এক বিচিত্র মঞ্চ, সেখানে অজস্র কুশীলবের ভিড়। সেই ইতিহাস-পূর্ব সময় থেকেই।

সুন্দরবন অঞ্চলের হিংস্র জন্তুদের ঠকানোর জন্য তৈরি হয়েছে পশ্চাৎ-মুখোশ। এর জন্ম অবশ্য একেবারেই সাম্প্রতিক। এ মুখোশ মুখে না-পরে মাথার পিছন দিকে ঘাড়ের অংশ ঢেকে পরা হয়। পিছনে হঠাৎ আসা আক্রমণ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য এমন ভাবনা। দক্ষিণরায়কে বিভ্রান্ত করতেই তৈরি হয় বড় বড় চোখওয়ালা এই মুখোশগুলি। এগুলো মূলত পোড়ামাটি কিংবা কাঠ দিয়ে তৈরি। কখনও আবার সাদা-কালো রঙে নাক-মুখ ফুটিয়ে তোলা হয় ন্যাড়া মাথার পিছন দিকে। ধর্মীয় উৎসব লৌকিক উৎসবে পরিণত হয়েছে লোকনৃত্য ও লোকনাট্যানুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে। যেমন বাংলার চেনা ছবিতে ছিল চৈত্র মাসে মহাদেব নৃত্য, নির্দিষ্ট খোলা প্রাঙ্গণে এসে ঢে়াল বাজানো। অন্যজন উঁচু করে মুখোশটি তুলে ধরে ভূমিকে প্রণাম করে নৃত্যের জন্য তৈরি হন। তারপর কেউ একজন মুখোশটি বেঁধে দেন। মুখোশের সঙ্গে ঘর্ষণ থেকে মুখকে রক্ষা করার জন্য কান ঢেকে পাগড়ি বাঁধা হয়। সাদা-কালো রঙে রাঙানো, তিন বা পাঁচটি সাপের ফণা দিয়ে সাজানো মহাদেবের মুখোশ। শিল্পীর এক হাতে ত্রিশূল, অপর হাতে শঙ্খ। ধীর থেকে চরমে পৌঁছয় নৃত্যের লয়। কালীনৃত্যের সময় পুরুষ নৃত্যশিল্পী লাল-নীল কাপড় পরে একহাতে নেন খড়্গ আর অন্য হাতে প্রদীপ। শিব আগেই শুয়ে থাকে। চারদিক ঘুরে ঘুরে কালীনৃত্য চলে। অন্য অনেক মুখোশনৃত্যে গুরুত্ব পায় নানা জীবজন্তু, কিংবা দাম্পত্য জীবন নিয়ে কোনও কৌতুক দৃশ্য। যুদ্ধের প্রস্তুতি বা যুদ্ধ জয়ের উত্তেজনা নৃত্যের মাধ্যমে নান্দনিক চেহারা নেয়। ছৌ নৃত্য আসলে ছিল শারীরিক পটুত্বের পরিচয় দিয়ে সাধনায় সিদ্ধিলাভ। ছৌ নৃত্যের ‘কাপঝাপ’ এই ইঙ্গিত দেয়। ছিল চুন-কালি মেখে নাচ। ১৭৫৩ সাল নাগাদ সামন্ত রাজাদের ডাকে বর্ধমান থেকে মৃৎশিল্পীরা এসেছিলেন রাধাগোবিন্দ মন্দির ও প্রতিমা নির্মাণের কাজে। এই শিল্পীদের দ্বারা প্রভাবিত হয়েই তৈরি হয়েছিল রঙিন মুখোশ। আর কথক ঠাকুর ও ব্রাহ্মণদের কাজ থেকে, নানা পৌরাণিক চরিত্রের মুখের নানা বৈচিত্র সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা তৈরি করে নিয়েছিলেন পুরুলিয়ার বাঘমুন্ডি অঞ্চলের চড়িদা গ্রামের সূত্রধরেরা। প্রথমে কেঁচো মাটি বা নরম মাটির মুখ তৈরি হয়। তারপর তাতে পড়ে ছাইয়ের প্রলেপ। তারপর আঠা দিয়ে একটির পর একটি কাগজ সাঁটা হয়, রোদে শুকিয়ে পাতলা মাটির আস্তরণ চাপানো হয়। চোখ-মুখ ঠোঁটের ভাঁজ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। মাটির গোলাতে ভেজানো সুতির কাপড় সেঁটে দেওয়া। শুকিয়ে গেলে টোকা মারলে খুলে যায় নিচের মাটির মুখ। এরপর মুখোশটি গাছের পাতা দিয়ে ঘসে মসৃণ করা হয়। রং করা হয়। শেষে জরি, রাংতা, চুমকি, পুঁতি ও পালক লাগিয়ে মুখোশটির সাজ সম্পূর্ণ হয়। প্রধানত রামায়ণ, মহাভারত ও পুরাণের বিষয় গুরুত্ব পেয়েছে ছৌ নাচে, কিন্তু কোনও লৌকিক বিষয় গুরুত্ব পায়নি। এ অঞ্চল একসময় জৈন ও বৌদ্ধধর্ম দ্বারা প্রভাবিত ছিল, কিন্তু বর্তমান ছৌ নৃত্যের ধারায় সে ইঙ্গিত মেলে না। যদিও বৌদ্ধ গান ও দোহায় বুদ্ধ নাটকের উল্লেখ আছে। তামাং সম্প্রদায় অধ্যুষিত অঞ্চলে তান্ত্রিক বা বজ্রযানী বৌদ্ধধর্মের ওপর ভিত্তি করে, বাকপা নৃত্যে ব্যবহৃত হয় নানা রঙে রাঙানো কাঠের মুখোশ। আবার বাংলার ডোম জাতি নানা পরিস্থিতিতে তুলে ধরেছিল তাদের বীর রূপ। ‘আগডুম-বাগডুম’ লোকক্রীড়ার ছড়াটিও তার সাক্ষী।

দুর্গ অর্থাৎ ছাউনিতে যে-নৃত্যচর্চা, তাই হল সৈন্য সাজে ছৌ-নৃত্য। সংলাপহীন। নদিয়ার তেহট্ট-১ ব্লকের নফরচন্দ্রপুর গ্রামের মালপাহাড়ি আদিবাসী গোষ্ঠী মাঘী পূর্ণিমার রাতে তীরধনুক পুজো উপলক্ষে এবং শিকারে যাওয়ার আগে শোলার তৈরি মুখোশ পরে নৃত্য করেন। সঙ্গে বাজে ঢোল-কাঁসি। রামায়ণে যুদ্ধ, শূকর শিকার নৃত্যের বিষয় হয়ে উঠেছে। নদিয়ার নাজিপুর ও বেতাইয়ে এই মুখোশ তৈরি হয়।

মেদিনীপুর জেলার বেলিয়াবেড়ার নোটা ও চেনাবাড়িয়া গ্রামের দলাই পদবিধারীরা কাগজ-কাপড়-কাদামাটি দিয়ে তৈরি করেন নানা ধরনের রঙিন মুখোশ। মুখোশের বিষয় পৌরাণিক চরিত্র, ভূত-প্রেত-রাক্ষস, পশু-পাখি। এ মুখোশগুলি শীতলার গান, বহুরূপী ও সংয়ের সাজে ব্যবহৃত হয়। রাধাকৃষ্ণের গীত নিয়ে কাঠি নৃত্যে আছে মুখোশের ব্যবহার। লবণ, নিমফল, তুঁতে মেশানো গরম জলে গামার কাঠ দু’-তিনদিন ভিজিয়ে রেখে তৈরি হয় এই মুখোশ। কতটা জোরে মারতে হবে, কতটা কাটতে হবে, এই অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়েই তৈরি হয় কাঠের মুখোশ। যাই হোক, দুর্গাপুজোর শেষ তিনদিন বিষ্ণুপুরের রঘুনাথ জিউ মন্দিরকে ঘিরে চলে রাবণকাটা নৃত্য। কুম্ভকর্ণ বধ দিয়ে শুরু। একাদশীর দিন বধ হয় ইন্দ্রজিৎ। দ্বাদশীর দিন রাবণ। বারো ফুট উঁচু মাটির মূর্তি ও দশটি কাঠের মাথা নিয়ে রাবণ। নৃত্য করে অন্য প্রান্তে থাকা বিজয়ীরা, মুখোশ এঁটে পাটের পোশাক পরে সেজে থাকা রাম-ভক্ত বৈষ্ণব। এঁরা নিম্ন বৃত্তির মানুষ। কালো জাম্বুবান, সাদা সুগ্রীব ও হনুমান। সঙ্গ থাকেন লাল বিভীষণ। পাড়ায় পাড়ায় ঘোরেন এরা। বাজে নাকাড়া, টিকারা, কাঁসি, ঝাঁঝ। বীরভূমের ধর্মরাজের ভক্তরা কাঠের চামুণ্ডা মুখোশ পরে নৃত্য করে। জয়নগরের কালীনৃত্যেও মুখোশের ব্যবহার আছে। দক্ষিণ চব্বিশ পরগনায় বনবিবি পালায় বাঘের মুখোশ গুরুত্ব পায়। মেদিনীপুর-ঝাড়খণ্ড সীমান্তে মুখোশ পরা নাচকে বলে মহড়া নাচ।

পশ্চিম দিনাজপুরের চামুণ্ডাপুজোর দেবীর রূপ হল একটি মুখোশ। চৈত্র সংক্রান্তিতে ত্রিমোহিনী গ্রামে দাপট কালীর পুজোয় একটি ভগ্ন শিলাখণ্ডকে মুখোশ পরিয়ে পুজো করা হয়। আবার গাছে মুখোশ বেঁধে দক্ষিণ দিনাজপুরে শ্মশানকালীর পুজো হয়। মালদার জহুরা কালীও একটি মুখোশ। গর্ভগৃহে একটি সিঁদুরচর্চিত গোলাকার স্তূপের উপর কালিকার মুখমণ্ডল এবং দু’পাশে আরও দু’টি ছোট ছোট মুখ থাকে। চৈত্রমাসে মালদায় গম্ভীরা পুজো উৎসবের দ্বিতীয়-তৃতীয় দিনের তামাশা পর্বে শিবের বন্দনা করে হয় মুখোশ নৃত্য। অবশ্য পালাগানে মুখোশের ব্যবহার নেই। এই নৃত্যে নিমকাঠের নরসিংহী মুখোশটি বেশ বড়। দীর্ঘ নাক, বড় লাল জিভ এবং দু’টি শিং নিয়ে অদ্ভুত রূপ। কালীকাচ নৃত্য হল বেতের অর্থাৎ ‘কাচ’-এর আঘাতে বেজে ওঠা ঢাকের বোলের সঙ্গে সঙ্গে মুখোশ নৃত্য। জলপাইগুড়ির গাইযাত্রা নৃত্যেও মুখোশের ব্যবহার আছে। তেল, সিঁদুর দিয়ে পুজো করে তুলে রাখা মুখোশ ঘর থেকে বের করে এনে, তা মুখে এঁটে রাজা, মন্ত্রী, চাকর, বাঘ এরকম নানা চরিত্র নিয়ে জলপাইগুড়ির মুখাখেইল নৃত্য। দিনাজপুরে গোমিরা উৎসবের অর্থ গ্রামচণ্ডীর সম্মানে গামিরা খেলা এবং মূলত উত্তর দিনাজপুরের পৌরাণিক কাহিনিনির্ভর মোখা নাচ বেশ জনপ্রিয়। গ্রামচণ্ডীর শক্তিরূপ বা চণ্ডীয়াল পালা, উড়ানকালী বা শিকনি ঢাল, বুড়ো-বুড়ি, ছোকরা-ছুকরি এবং রামায়ণের চরিত্র বেশ আকর্ষণীয়। শিমুল, ছাতিম, গামার, নিম কাঠ দিয়ে মুখোশগুলি তৈরি হয়। এগুলোকে রঙিন করে তুলতে ব্যবহৃত হয় চুন-সিঁদুর, সাদা খড়ি মাটি, হাঁড়ির কালি। সঙ্গে তেঁতুল বীজ ও বেলের আঠা। কাঠের মুখোশ ছাড়াও লাউয়ের মুখোশ, শোলার মুখোশ, এমনকী কাগজের মুখোশও ব্যবহৃত হয়। মুখোশ শিল্পীরাও কাঠের মুখোশ তৈরির পাশাপাশি বাঁশের মুখ বা মুখোশ তৈরি করে এই শিল্প মাধ্যমটিকে বেশ আকর্ষণীয় করে তুলেছেন। জলপাইগুড়ি ও পশ্চিম দিনাজপুরে কালীপুজোর অমাবস্যা তিথিতে চোর-চুরনির গানে শোলার মুখোশ ব্যবহৃত হয়। বলা বাহুল্য, উত্তরবঙ্গে মুখোশকে বলা হয় মোখা। কথিত আছে, যিনি কাঠের মুখোশ ধারণ করেন তাঁর উপর দেবী বা জাদুশক্তি ভর করে। পূজকের কাছে নতুন কাঠের মুখোশের প্রাণ প্রতিষ্ঠা করা এবং শুদ্ধ চিত্তে তা ধারণ করার রীতিও আছে। এই আবেগ ও বিশ্বাস দিয়ে মুখোশগুলি সারা বছর তার গুরুত্ব অটুট রাখে। যাই হোক, দার্জিলিংয়ে দেখা যায় সিংহের মুখোশ নিয়ে তিব্বতীয় মুখোশ নৃত্য সিঙ্গিছম, মুখোশ পরে ভুটিয়াদের মহাকাল নৃত্য এবং আদিবাসীদের ডাইনি-পিশাচ নৃত্য। গুমরিমতি পালায় ব্যবহৃত হয় মেচ মুখোশ। ঝাড়গ্রামের পারভা নাচের কাঠের মুখোশগুলি বেশ বড়। কথিত আছে, চিলকিগড় রাজবাড়ির পাইকরাই একসময় এই নাচ করতেন।

দেবতার থানে ছলন দেওয়ার রীতি কিংবা টোটেম-স্মৃতির মতো মুখোশকে ঘিরে থাকা লোকাচার বিশ্বাসের সঙ্গেও জড়িয়ে আছে অলৌকিক ভাবনা বা জাদুবিশ্বাস। মুখমণ্ডল বা মূর্তি তৈরির পাশাপাশি তৈরি হয়েছিল চামড়া, গাছের ছালে তৈরি মুখোশ এবং পরবর্তীকালে মাটি ও কাঠের মুখোশ। আবার পুজো-পার্বণের আনন্দকে নতুন মাত্রা দিতে গুরুত্ব পেল মুখোশ নৃত্য। মুখ ও মুখোশের দ্বন্দ্ব নিয়ে নৃত্যের আবেগেও নাটকীয় দ্বন্দ্ব তৈরি হল। গুরুত্ব পেল কাহিনি বা কয়েকটি মুহূর্ত। নানা চরিত্র নিয়ে সেজে উঠল মুখোশ। এই বৈচিত্রগুণে পরবর্তীকালে মুখোশ যেমন শিশুদের খেলনা হয়ে উঠেছে, তেমনই হয়েছে গৃহসজ্জার উপকরণ। দক্ষিণ দিনাজপুরের কুসমুণ্ডির কাঠের মুখোশের পাশাপাশি সস্তার বাঁশের মুখোশও ইদানীং গুরুত্ব পাচ্ছে। পুরুলিয়ার চড়িদায় কাগজের মণ্ড দিয়ে তৈরি হচ্ছে ঘর সাজানোর নানা ধরনের মুখোশ। বর্তমানে নিত্য নতুন মুখোশ তৈরি হচ্ছে। মুখোশের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা লৌকিক আবেগ ও জাদু বিশ্বাস মুখোশের আড়ালেই লুকিয়ে পড়েছে। কারণ শিল্পী বাঁচতে চায়। কেন্দ্রীয় এবং রাজ্য সরকার এর যুগ্ম অর্থনৈতিক সহযোগিতা প্রয়োজন। এছাড়াও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে ভারতের প্রাচীন ঐতিহ্য এবং চিরাচরিত সংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব।

 

 

Scroll to Top